August 24, 2026, 6:16 am
কমানো হয়েছে ঋণের সুদহার। দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা। পাশাপাশি রয়েছে মহামারীর ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা দিতে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণের চাপ। এতে করে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ বাড়ার কথা। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ভিন্ন কথা। বেসরকারি খাতের ঋণ বাড়েনি, উল্টো কমে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহামারীর কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য মন্দা। নতুন করে বিনিয়োগে আসছে না উদ্যোক্তারা। অনেকে সংকটে টিকে থাকতে বিদ্যমান ব্যবসা সংকুচিত করছে। এছাড়া ব্যাংকগুলোতে যে হারে ঋণ পরিশোধ হয়েছে সেই হারে ঋণ বিতরণ হয়নি। সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৯৫ হাজার ২০১ কোটি টাকা। এই অংক গত বছরের জুলাইয়ের চেয়ে ৯ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি।
তবে পরিসংখ্যানের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুনের তুলনায় জুলাইয়ে বেসরকারি ঋণ না বেড়ে উল্টো কমে গেছে। গত জুন মাসে ঋণস্থিতি ছিল ১০ লাখ ৯৭ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। জুলাইতে তা নেমে এসেছে ১০ লাখ ৯৫ হাজার ২০১ কোটি টাকায়। সে হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে ঋণ কমেছে ২ হাজার ৯৯ কোটি টাকা বা দশমিক ১৯ শতাংশ কম।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মাহমারির কারণে রফতানি কমে গেছে। স্থানীয় বাজারে পণ্যের চাহিদাও কম। সব মিলিয়ে চলমান পরিস্থিতিতে ঝুঁকি নিয়ে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আসছে না। অনেকে সংকটে টিকে থাকতে বিদ্যমান ব্যবসা সংকুচিত করছে। এসব কারণে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ কমেছে। যা অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। কারণ ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ার মানে কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে। এই অবস্থা প্রবৃদ্ধি, উৎপাদন ও সেবা খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তিনি বলেন, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে বেসরকারি ঋণ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। তাই যে কোনো প্রক্রিয়ায় ঋণ বাড়তে হবে। এ ক্ষেত্রে রফতানি, ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প ও উৎপাদনমুখী খাততে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে।পাশাপাশি সরকারের ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা কমিয়ে রাজস্ব বাড়ানো ও বিদেশি উৎস থেকে কম সুদে ঋণ আনার পরামর্শ দেন সাবেক এ গভর্নর।
এদিকে করোনাভাইরাস মহামারিতে বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং সরকারের নির্ধারিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন মুদ্রানীতিতে চলতি অর্থবছরের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আগের বছরের মত অপরিবর্তিত রেখে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মুদ্রানীতিতে বেসরকারি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে লিখিত বক্তব্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, করোনাভাইরাস মহামারিতে বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন বিনিয়োগ জোরদারকরণে বেসরকারি খাতে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি পর্যাপ্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে বলেন গভর্নর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের বেসরকারি খাতে ২০১০-১১ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৫ দশমিক ৮০ শতাংশ। ২০১১-১২ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি কমে হয় ১৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এর পরের ২০১২-১৩ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ব্যপকহারে কমে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশে। এরপর টানা তিন অর্থবছর প্রবৃদ্ধি বাড়ে। ২০১৩-১৪ অর্থবছর প্রবৃদ্ধি হয় ১২ দশমিক ২৭ শতাংশ। পরে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বেড়ে হয় ১৩ দশমিক ১৯ শতাংশ। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা আরো বেড়ে হয় ১৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৬৬ শতাংশে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সেটি আবার বেড়ে হয় ১৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এর পর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনক হারে কমে ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ দাড়ায়।
২০১৯-২০ অর্থবছরের ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। কিন্ত তা অর্জন হয় মাত্র ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম।