April 18, 2026, 5:47 pm

সমন্বয়হীনতার অভাবে একই মেডিকেল সরঞ্জাম কেনা হয়েছে বারবার

সমন্বয়হীনতার অভাবে একই মেডিকেল সরঞ্জাম কেনা হয়েছে বারবার

কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য ভেন্টিলেটর, পিসিআর কিট, এন-৯৫ মাস্ক ও আইসিইউ বেডসহ মেডিকেল সরঞ্জাম কেনায় বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড পেন্ডামিক প্রিপারেডনেস’ প্রকল্পের আওতায় সম্প্রতি ১৩৫ কোটি টাকার বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনা হয়।

এগুলো রাজধানীর মহাখালী মার্কেটের গুদামে মজুদ করা হলেও এখনও বিতরণ করা হয়নি। এ তথ্য জানা না থাকায় একই ধরনের পণ্য কিনেছে সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোর ডিপার্টমেন্ট (সিএমএসডি)।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উল্লিখিত প্রকল্পের পর্যালোচনা বৈঠকে তুলে ধরা হয় এই সমন্বয়হীনতার চিত্র। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

এতে আরও উল্লেখ করা হয়, এই প্রকল্পের আওতায় ১৩৫ কোটি টাকার পিপিই, এন-৯৫ মাস্ক, ভেন্টিলেটর, ৭০ হাজার পিসিআর কিট, আইসিইউ বেড থ্রি-ফাইভ ফাংশন বেডসহ মেডিকেল ইকুইপমেন্ট কেনা হয়েছে।

কিছু পিপিই, মাস্ক, গ্লাভস বিতরণ করা হলেও ভেন্টিলেটর, থ্রি ফাংশন ও ফাইভ ফাংশন বেড ও আইসিইউ বেড মহাখালী মার্কেটে গুদামজাত করে রাখা হয়েছে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে ওই বৈঠকে সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোর ডিপার্টমেন্ট (সিএমএসডি) পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামান বলেন, বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পের আওতায় পিসিআর কিট, এন-৯৫ মাস্ক, আইসিইউ বেড ও ভেন্টিলেটর ইত্যাদি কেনা হয়েছে।

কিন্তু বিতরণ করা হয়নি। এ তথ্যটি জানা থাকলে সিএমএসডি আইসিইউ বেড, ভেন্টিলেটর ইত্যাদি কেনার উদ্যোগ গ্রহণ করত না। এতে সরকারি অর্থের সাশ্রয় হতো।

জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কেনাকাটায় সমন্বয়হীনতার মাধ্যমে অর্থের অপচয় হয়েছে।

পরিকল্পনার ঘাটতি ফুটে উঠেছে। কোভিড-১৯ কেনাকাটায় কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ নেই, যারা এসব বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করবে। এর মধ্য দিয়ে স্বচ্ছতার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে।

এটি রাষ্ট্রীয় কেনাকাটা। ব্যক্তিগত কেনাকাটা নয়। এখানে সমান প্রতিযোগিতার প্রয়োজন আছে। এ ধরনের কেনাকাটায় বিশেষ কোনো অসৎ উদ্দেশ্য আছে কিনা, চাহিদার সঙ্গে সমন্বয়হীনতা রয়েছে কিনা, দুর্নীতি হয়েছে কিনা- এসব বিষয় সরকারের খতিয়ে দেখা দরকার আছে।

ওই বৈঠকে প্রকল্পের আওতায় ক্রয়কৃত মাস্ক, গ্লাভস, ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ বেড কোথায় সরবরাহ করা হবে এর একটি তালিকা দ্রুত সিএমএসডিতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়।

এছাড়া মেডিকেল ইকুইপমেন্ট কেনার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের লাইন ডিরেক্টররা সিএমএসডিতে যে রিকুইজিশন পাঠাবেন তার সঙ্গে কোথায় কোথায় এসব ইকুইপমেন্ট সরবরাহ হবে এর তালিকা সিএমএসডিতে পাঠাতে বলা হয়।

পাশাপাশি করোনা মোকাবেলায় সুরক্ষা সরঞ্জাম ও মেডিকেল ইকুইপমেন্ট কেনাকাটার ক্ষেত্রে সিএমএসডির পরিচালক, লাইন ডিরেক্টর ও প্রকল্প পরিচালকদের ক্রয় কার্যক্রমে দ্বৈততা পরিহার করার নির্দেশ দেয়া হয়।

পাশাপাশি এসব কাজের সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে (ডিজি)।

ওই বৈঠকে ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড পেন্ডামিক প্রিপারেডনেস’ প্রকল্পের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ না দিয়ে রাজস্ব বাজেটে পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এজন্য জনবল নিয়োগের প্রস্তাব দ্রুত অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে। আর প্রকল্পের পুনর্গঠিত ডিপিপিতে ভ্যাকসিনের জন্য বরাদ্দ ৪ কোটি মার্কিন ডলার (৩৪০ কোটি টাকা) বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

বৈঠকের সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলে এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত অনেক আইটেমের প্রয়োজনীয়তা হবে না। ভ্যাকসিনের সুসংবাদ পাওয়া গেলে পুনরায় প্রকল্প কার্যক্রম পর্যালোচনা করতে হবে।

জানা গেছে, করোনাভাইরাস শুরু হলে ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড পেন্ডামিক প্রিপারেডনেস’ একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ১২৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন হচ্ছে ৮৫০ কোটি টাকা। সরকারের অর্থায়নের পরিমাণ হচ্ছে ২২৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা। গত এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে আগামী ২০২৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা।

তবে প্রকল্প থেকে বাদ দেয়া হয়েছে রাজধানীর ‘মহাখালী মার্কেটে আড়াইশ’ শয্যার হাসপাতাল চালু ও হ্যান্ডওয়াশ কর্নার স্থাপন কার্যক্রম।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের ক্রয় প্রক্রিয়া ও পণ্য সরবরাহ চেইনটি যথাযথ কাজ না করার কারণে অনেক যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোর ডিপো (সিএমএসডি) গুদামে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে।

রিকুইজিশন পাঠানোর সময় ক্রয়কৃত মালামাল কোথায় কোথায় যাবে এর তালিকা সংযুক্ত করা হলে এর থেকে উত্তরণ সম্ভব।

অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার বলেন, প্রকল্পের আওতায় জনবল নিয়োগ না করে রাজস্ব বাজেটের আওতায় জনবলের পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে।

বৈঠকে স্বাস্থ্য সচিব মো. আবদুল মান্নান বলেন, একটি ভ্যাকসিনের মূল্য ৪০ ডলার হতে পারে। ডাক্তার ও নার্সসহ করোনা মোকাবেলায় সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে ১০ লাখ কর্মী কাজ করছে। সে হিসাব ধরে এই প্রকল্পের আওতায় ভ্যাকসিন খাতে বরাদ্দ রাখা যেতে পারে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ফাতেমা ইয়াসমিন বলেন, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এই প্রকল্পে ১০ কোটি মার্কিন ডলার দিয়ে যুক্ত হতে চায়। এজন্য প্রকল্প সংশোধন করার প্রয়োজন হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক জুয়েনা আজিজ বলেন, ডিপিপি পুনর্গঠন করতে সময় লেগে যেতে পারে। এজন্য পরিকল্পনা কমিশনের অনুমতি সাপেক্ষে বর্তমানে প্রয়োজন নেই- এমন খাতগুলো থেকে অর্থ অন্য খাতে নিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন মহাখালী মার্কেটে ২০০ শয্যা কোভিড-হাসপাতাল আলাদা চালু করার প্রয়োজনীয়তা বর্তমানে নেই।

প্রকল্পের আওতায় আইসিইউ বেডসহ অন্যান্য মেডিকেল সরঞ্জাম দ্রুত সরবরাহ করা প্রয়োজন। অন্যথায় এসব পণ্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কোভিড-১৯ মোকাবেলায় উল্লিখিত প্রকল্পের আওতায় পিসিআরসহ ২১টি প্রতিষ্ঠানে আধুনিক মাইক্রোবায়োলজি পরীক্ষাগার স্থাপন, প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে ২০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার ও ৫টি ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট এবং ঢাকা সিটি উত্তর কর্পোরেশনের মহাখালী ফ্রন্টলাইন ওয়ার্কারদের জন্য আড়াইশ’ শয্যা আলাদা কোভিড-১৯ হাসপাতাল চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এছাড়া সংক্রমণ রোগ শনাক্ত করতে তিনটি আন্তর্জাতিক ও ৮টি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর ও ৩টি সমুদ্রবন্দরে মোট ১৬টি মেডিকেল সেন্টার স্থাপন, ৪৯২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৬৪টি জেলা ও ১৭টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হ্যান্ডওয়াশ সেন্টার স্থাপনের কথা বলা হয়।

এছাড়া ১৭টি মেডিকেল হাসপাতালে ইনফেকশন ডিজিস ডিপার্টমেন্ট, জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ৬৪টি ইপিআই ইউনিট, সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারী হাসপাতালগুলোতে ৮১টি ইনফেকশন প্রিভেনশন কন্ট্রোল ইউনিট করা হবে।

সূত্র: যুগান্তর

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com