June 5, 2026, 8:26 am

করোনার বছরেও শিবলী রুবাইয়াত কমিশনের চমক, আশার আলো পুঁজিবাজারে

করোনার বছরেও শিবলী রুবাইয়াত কমিশনের চমক, আশার আলো পুঁজিবাজারে

করোনা মহামারির কারনে বিনিয়োগকারীসহ দেশের সকল শ্রেণীর মানুষকে চলতি বছরের অধিকাংশ সময় কাটাতে হয়েছে আতঙ্কের মধ্য দিয়ে। এছাড়া এখনো একটি অংশ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। এরপরেও দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসই ব্রড ইনডেক্স (ডিএসইএক্স) আগের বছরের চেয়ে ২০২০ সালে ৯৪৯.১৩ পয়েন্ট বা ২১.৩১ শতাংশ বেড়েছে। যা বাজার মূলধনকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

মূল্যসূচকে এই উত্থানের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশনের ইতিবাচক ও কার্যকরি ভূমিকা। এছাড়া কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ ও এফডিআরের সুদ হার তলানিতে নেমে আসায় শেয়ারবাজারে বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যে উন্নয়নের পথ তৈরীতে ভিত্তি গড়ে দিয়েছে বিগত কমিশনের ফ্লোর প্রাইস নির্ধারন। অন্যথায় করোনার আতঙ্কে শুরুতে শেয়ারবাজারে অনাকাঙ্খিত অনেক কিছুই ঘটতে পারত।

ডিএসইএক্স আগের বছরের চেয়ে ৯৪৯.১৩ পয়েন্ট বা ২১.৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে বছরের শেষ দিন ৫৪০২.০৭ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে৷ যা ২০২০ সালের সর্বোচ্চ অবস্থান। এবছর সূচকটি সর্বনিম্ন ৩৬০৩.৯৫ পয়েন্টে নেমেছিল৷

অপর সূচকগুলোর মধ্যে ডিএসই ৩০ সূচক (ডিএস৩০) ৪৫০.৬১ পয়েন্ট বা ২৯.৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৬৩.৯৬ পয়েন্টে দাড়িঁয়েছে। এছাড়া ডিএসইএক্স শরীয়াহ্ সূচক (ডিএসইএস) ২৪২.২৮ পয়েন্ট বা ২৪.২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১২৪২.১১ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে৷

সূচকের এই উন্নতির মাধ্যমে ২০২০ সালে বাজার মূলধন (সিকিউরিটিজের দাম) ডিএসইর ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে৷ ডিএসই বাজার মূলধন আগের বছরের তুলনায় ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা বা ৩২.০১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে৷

করোনা মহামারির কারনে ২০২০ সালে ডিএসইতে ২০৮ দিন লেনদেন হয়েছে৷ এ বছর ৬৬দিন বন্ধ থাকায়, ওইসময় ৩৮ কার্যদিবস লেনদেন হয়নি। এরপরেও ২০২০ সালে ডিএসইতে মোট ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯৮১ কোটি ২২ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে৷ যা ডিএসই’র ইতিহাসে ৫ম সর্বোচ্চ লেনদেন।

২০২০ সালে আগের বছরের চেয়ে ২১ হাজার ১৫৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বা ১৮.৫৯ শতাংশ বেশি লেনদেন হয়েছে৷

এই বছর ডিএসইতে গড়ে প্রতি কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছে ৬৪৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকার৷ যার পরিমাণ ২০১৯ সালে ছিল ৪৮০ কোটি ২৬ লাখ টাকা৷ ওই বছরে ২৩৭ কার্যদিবসে মোট লেনদেন হয়েছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৮২১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বিদায়ী বছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন হয়েছে ১০ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা। যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা বেশি। গত তিন বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ লেনদেন।

ডিএসইর তথ্য মতে, ২০২০ সালে ডিএসইতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেন হয়েছে ১০ হাজার ৩৮৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। যা মোট লেনদেনের ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে ডিএসইতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেনের হয়েছিল ৭ হাজার ৮৪৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। যা মোট লেনদেনের ৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ ছিল।

২০২০ সালের প্রথম থেকে দেশের পুঁজিবাজারের সূচক কমতে থাকে; পতন ঠেকাতে শেয়ারের সর্বনিম্ন দাম বেঁধে দেওয়া হয়। এতে তাৎক্ষণিকভাবে বাজার চাঙা হলেও দীর্ঘ মেয়াদে আশানুরূপ ফল মেলেনি। এর মধ্যেই করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে নজিরবিহীনভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় দেশের পুঁজিবাজার। বিরল এই পদক্ষেপকে তখন টেকসই পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখেননি বিশেষজ্ঞরা।

ডিএসই ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএর সাবেক সভাপতি আহমেদ রশিদ লালী বলেন, এর আগে কোনো দিন বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এভাবে বন্ধ হয়নি। ১৯৮৮ সালে বন্যা হয়েছিল; সেসময় পানি ঢুকে গিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ তিন চার দিন বন্ধ ছিল। এক দিকে অর্থনীতির খারাপ অবস্থা, অন্যদিকে পুঁজিবাজারের পতন ঠেকাতে শেয়ারের সর্বনিম্ন দাম বেঁধে দেওয়ায় লেনদেন গিয়ে ঠেকেছিল তলানিতে।

এর মধ্যেই জুলাইয়ের শেষ ভাগ থেকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার। এর পেছনে তিনটি কারণ খুঁজে পেয়েছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।

# আমানতের সুদের হার ৫ শতাংশে এবং ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে বেঁধে দেওয়া। এর ফলে কম ‍সুদে ঋণ পেয়েছেন উদ্যোক্তারা। ব্যাংক সুদ আকর্ষণীয় না হওয়ায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বেড়েছে।

# সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের বাস্তবায়নের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাগুলো দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে থাকে।

# বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার নতুন নেতৃত্বের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে

প্রায় নয় বছর পর মে মাসে নতুন নেতৃত্ব পায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। অনেক দেরিতে হলেও কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির ব্যবস্থাসহ পুঁজিবাজারের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর সিদ্ধান্ত নেয় নতুন কমিশন।

আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুজ্জামান বলেন, পুঁজিবাজারের কারসাজির বিষয়ে কমিশনের শক্ত ভূমিকা বিনিয়োগকারীদের ‘আস্থা ফেরাতে ভূমিকা’ রেখেছে। এছাড়া অনেক সমালোচনার মুখেও আগের কমিশনের বেঁধে দেওয়া শেয়ারের সর্বনিম্ন দরের সীমা উঠিয়ে দেয়নি নতুন কমিশন। এটা শেষ পর্যন্ত কাজে লেগেছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

নয় বছর পর নতুন নেতৃত্ব এসেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে, তাদের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ এমরান হাসান বলেন, বিশ্বে এটা একটা বিরল ঘটনা। বিনিয়োগকারীদের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।করোনার কারণে পুঁজিবাজার প্রায় ৬৩ দিন বন্ধ ছিল; বিনিয়োগকারীদের টাকা আটকে গিয়েছিল, কেউ চাইলেও টাকা বের করতে পারছিলেন না। ফ্লোর প্রাইস নিয়ে একটা সমস্যা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা ওয়ার্কআউট করেছে। প্রথমে লেনদেন হচ্ছিল না। পরে এই ফ্লোর প্রাইস কাজ করেছে।

তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর প্রতি মাসের বিনিয়োগ নজরদারির একটা নিয়ম চালু করে নতুন কমিশন, যার ফলে পুঁজিবাজারে টাকার যোগান কিছুটা বাড়ে। এছাড়া উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ন্যূনতম শেয়ারধারণে বাধ্য করতে বিএসইসির কড়াকড়ির ফলে শেয়ারের চাহিদা বেড়ে যায় এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতেও ভূমিকা রাখে।

বিএসইসি ২০২০ সালে প্রায় ১৫টি আইপিওর অনুমোদন দিয়েছে। এর ফলে পুঁজিবাজারে বেশ কিছু টাকা বিনিয়োগ এসেছে। শর্ত পূরণ করতে না পারায় বেশ কিছু আইপিও বাতিল করেছে বিএসইসি, যার ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বাজে বিনিয়োগ থেকে ‘বেঁচে যায়’। বিনিয়োগকারীদের আটকে থাকা অর্থ ফেরতের উদ্যোগ নেয় বিএসইসি। কমিশনের পক্ষ থেকে বিলম্বিত হলেও বহুল প্রত্যাশিত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের ফলে আসছে বছর নিয়েও আশাবাদী পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।

এমরান বলেন, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। আগামী বছরে এটা চলমান থাকবে। এতে আমাদের পুঁজিবাজারও ভালো থাকবে বলে আমি মনে করি।

বেশ কিছু ভালো আইপিও পাইপলাইনে আছে। সেগুলো যদি চলে আসে পুঁজিবাজার সামনে আরও ভালো করবে। সুদের হার কম থাকবে। সেটাও আগামী বছর পুঁজিবাজারকে ভালো রাখতে সাহায্য করবে।

ডিএসই পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, ২০২১ সালে দেশের পুঁজিবাজার ২০২০ সালের চেয়ে ভালো করবে। বন্ড মার্কেট ভালো হবে, এসএমই বোর্ড চালু হবে। ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হবে।

বিজনেস নিউজ/এমআরএম/এসআর

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com