August 19, 2026, 3:46 pm
ইভ্যালি রান করবে, না দেউলিয়া ঘোষিত হবে সে সিদ্ধান্ত নেবে একমাত্র ব্যবস্থাপনা পরিচালক। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের আদেশে সুস্পষ্টভাবে সেটাই বলা আছে। কোম্পানি রান করার বিন্দুমাত্র সুযোগ থাকলে তার চেষ্টা না করে কোনো অবস্থাতেই লাখ লাখ মানুষকে পথে বসানোর সিদ্ধান্ত দেবে না ব্যবস্থাপনা পরিচালক।’ -এই কথাগুলো নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছিলেন, হাইকোর্ট বিভাগের আদেশে গঠিত ইভ্যালির পরিচালনা বোর্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির।
তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমি একা এই অফিস ঝাড়ু দিয়েছি। ২০-২৫ দিন শুধুমাত্র একা অফিস করেছি। দ্বিতীয় কেউ ছিল না। বাসায় গিয়ে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করেছি দুই মাস ধরে। অনেক কিছুই গুছিয়ে এনেছিলাম। আহা! আমাকে করা গালাগালির ভাষাগুলো দেখছি আর চরমভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছি। ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আমার আর কোনো অপশন নেই।’
তার এ ধরনের বক্তব্যে ইভ্যালির বর্তমান বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তারা বলেন, বিভিন্ন সময় ইভ্যালির বোর্ড চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এবং এমডি মাহবুব কবির নানা রকম হতাশাজনক কথা বলছেন। এতেই ফুটে ওঠে ইভ্যালির বোর্ডের দুর্দশার চিত্র।
এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘সম্ভাবনাময় ই-কমার্স ব্যবসার দুর্নাম ছড়িয়ে দিয়েছেন ইভ্যালির কর্তাব্যক্তিরা। তাদের কারণে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ কষ্টের টাকা বিনিয়োগ করে আজ রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে। মালিক-কর্তৃপক্ষের কারণেই ইভ্যালির আজ এই করুণ পরিণতি। এই ভঙ্গুর অবস্থা থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত দিতে মহামান্য হাইকোর্ট ৫ সদস্যের পরিচালনা বোর্ড গড়ে দিয়েছেন। এখন যদি বোর্ডের সদস্যরাই নানাভাবে হতাশাজনক কথাবার্তা বলেন তাহলে বিনিয়োগারীরা তো আরও হতাশ হয়ে পড়বেন। যারা লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এখন অর্থ ফিরে পাওয়ার সামান্যতম আশার আলো দেখছেন, বোর্ডের কর্মকর্তাদের কথায় তো তাদের আশাটুকুও নিভে যাবে। এ জন্য ভালো পরিচালনা বোর্ডের সদস্যরা যেন হতাশাজনক কথা না বলে বা তাদের মধ্যে যদি কারও সঙ্গে কোনো দূরত্ব থাকে তাহলে সেটি যেন কমিয়ে আনা হয়। এতে সবারই মঙ্গল।’
ইভ্যালির বর্তমান এমডি মাহবুব কবির তার ফেসবুক পেজে আরও লেখেন, ‘আমি কোম্পানির টাকায় এক কাপ চা-ও খাইনি, খাবও না। বিনা পারিশ্রমিকে নিজের গাড়ি, তেল-মবিল পুড়িয়ে অফিস করছি। সেখান থেকে বের হওয়ার দিন পর্যন্ত মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে তাই করে যাব। গালাগালি খুব করে করতে থাকুন, যাতে দ্রুত সেখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার পথ ত্বরান্বিত হয়। আল্লাহপাক আপনাদের হেফাজত করুন।’
তার এ হতাশাজনক মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মাহবুব কবির বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি বেশি কথা বলতে পারব না। ইভ্যালির কী হবে, না হবে সেসব বিষয়েও কোনো মন্তব্য করব না। তবে এটুকু বলতে পারি, আমি জানি না আগামীতে কী করব বা কী সিদ্ধান্ত নেব।’
অন্যদিকে ইভ্যালির ৭টি দামি গাড়ি নিলামে বিক্রির বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে গঠিত পরিচালনা বোর্ড। এ খবরে চরম ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন ইভ্যালিতে টাকা দিয়ে পণ্য পাননি এমন ক্রেতা এবং যেসব মার্চেন্ট প্রতিষ্ঠান পণ্য দিয়েছেন কিন্তু টাকা পাননি তারা। তাদের ভাষ্য, ইভ্যালির গাড়ি বিক্রি করে অর্থ নিজেরা ভোগ করবেন বোর্ডের সদস্যরা।
হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবিরের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তারা নানা রকম নেতিবাচক অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন।
ইভ্যালির এক ক্রেতা ফেসবুকে মাহবুব কবির ও বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ অন্য সদস্যদের নানা রকম নেতিবাচক কথা বলে পোস্ট দিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন, ‘মাহবুব কবির মিলন সাহেব সারাজীবন নীতি বাক্য বলে গেলেন। জীবনের শেষ সময় এসে আসল চেহারা দেখাচ্ছেন। ইভ্যালির এই বোর্ড কোনোভাবেই কিছু করতে পারবে না। যা সম্পত্তি আছে তা ভেঙে খাবার ধান্ধা করতেছে। মানিক সাহেব জীবনে ব্যবসা করেন নাই, মিলন সাহেব নিরাপদ খাদ্য নিয়া কাজ করছেন। ই-কমার্সের সংজ্ঞা লেখার ক্ষমতা নাই, তাদের দিছে এই দায়িত্ব। চুরি-চামারি করে খাওয়ার বাকি কাজটুকু এরা করবে। ইভ্যালির ব্যাংকে যে টাকা আছে ওই টাকা পুরোপুরি গ্রাহকদের টাকা। কোনোভাবেই এই টাকা মিটিংয়ের নামে খাওয়ার অধিকার নাই। ওনারা এইটা করতে পারেন না। ইভ্যালির গাড়ি বিক্রি করে ওনারা কী করবেন? বছরে একটা মিটিং করে ২ লাখ টাকা নেবেন মানিক সাহেব। বাহ কী নিয়ম। আর এই টাকা আসবে ইভ্যালির গাড়ি সেল করে। যে যেখান দিয়া পারেন প্রতিবাদ করেন। এই চোরদের হাত থেকে ইভ্যালির সম্পদ রক্ষা করেন।’
মঙ্গলবারও ইভ্যালির ক্রেতা-মার্চেন্ট কো-অর্ডিনেশন কমিটির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে নানা রকম নেতিবাচক কথা বলা হয়েছে ইভ্যালির বোর্ড সম্পর্কে। সংবাদ সম্মেলনে ইভ্যালি মার্চেন্ট অ্যান্ড কনজিউমার কো-অর্ডিনেশন কমিটির সহ-সমন্বয়ক সাকিব হাসান বলেন, ইভ্যালির বর্তমান পরিচালনা কমিটির কার্যক্রম স্পষ্ট নয়। পরিচালনা কমিটি ইভ্যালির গাড়ি বিক্রি না করে ব্র্যান্ডভ্যালু কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ করতে পারতেন। ইভ্যালির মোহাম্মদ রাসেলকে ছাড়া মার্চেন্ট ও ভোক্তাদের সংখ্যা জানা এবং ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তাই লাখ লাখ ভোক্তার মুক্তির কথা চিন্তা করে মোহাম্মদ রাসেলকে আমাদের জিম্মায় জামিন দিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করছি।
এ সময় তিনি আরও বলেন, ইভ্যালির বর্তমান বোর্ড চেয়ারম্যান বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের একেক সময় একেক বক্তব্যের কারণে আমরা বিভ্রান্ত হচ্ছি। তিনি একবার বলছেন ইভ্যালির কাছে গ্রাহক ১০০ কোটি টাকা পায়, একবার ৬ কোটি, একবার ৩ কোটি টাকার কথা বলছেন। আসলে সাধারণ জনতা কত টাকা ইভ্যালির কাছে পান তা রাসেল ছাড়া কেউ বলতে পারবেন না। তাই তাকে মুক্তি দিয়ে ইভ্যালি পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে।