August 18, 2026, 3:38 pm
দেশে বছরে আত্মহত্যা করেই মারা যাচ্ছে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। অর্থাৎ বছরে ১৩ হাজার মানুষ মারা গেলে সেই হিসাবে গড়ে দৈনিক মারা যায় ৩৫ জন। যা করোনায় দৈনিক মারা যাওয়ার হারকেও হার মানায়। তবে মানষিক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন দিনদিন আত্মহত্যার হার বাড়ছে। আত্মহত্যার কারণ হিসেবে সামাজিক, আর্থিক ও পারিবারিক চাপ বেড়ে যাওয়াকে দুষছেন গবেষক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। তবে আবার অনেকেই আত্মহত্যার মানসিকতা থাকলেও ভালো পরিবেশ পেয়ে ফিরে আসছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর এসডিজি লক্ষ্যমাত্রায় আত্মহত্যায় মৃত্যুর হার নিয়ে করা এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। এ ক্ষেত্রে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রায় ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে আত্মহত্যার হার বর্থমানের তুলনায় অর্ধেকের নিচে নামিয়ে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এদিকে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিবিএস এক অনুষ্ঠানে জানায়, ২০২০ সালের প্রথম ১০ মাসে আত্মহত্যায় মারা গেছে প্রায় ১১ হাজার জন। তবে ২০১৯ সালের পর এ সংক্রান্ত কোন তথ্য ওয়েবসাইটে দেয়নি বিবিএস।
বিবিএসের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯ সালে প্রতি লাখে গড়ে ৭ দশমিক ৫৬ জন মারা যায়।২০১৮ সালে প্রতি লাখে গড়ে ৭ দশমিক ৬৯ জন মারা যায় যার মধ্যে পুরুষের আত্মহত্যায় মৃত্যুর হার ৭ দশমিক ৭০ এবং নারীর আত্মহত্যায় মৃত্যুহার ৭ দশমিক ৬৮। অর্থাৎ পুরুষের তুলনায় নারীর আত্মহত্যায় মৃত্যুর হার কম। তবে ২০১৭ সালে দেখা যায় ওই বছরে লাখে গড়ে ৩ দশমিক ৭৯জন মারা যায়। যদিও আগের দুই বছর ২০১৫ ও ২০১৬ সালে লাখে গড়ে ৭ দশমিক ৬৮ ও ৭ দশমিক ৮৪ জন মারা যায়।
তবে পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে প্রতিবছর গড়ে ১০ হাজার মানুষ ফাঁসিতে ঝুলে ও বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। এর বাইরে ঘুমের ওষুধ খাওয়া, লাফিয়ে পড়া, রেললাইনে ঝাঁপ দেওয়ার মত ঘটনাও থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর বিশ্বে আট লাখ লোক আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর হার প্রতি লাখে ১৬ জন।
এদিকে সম্প্রতি আঁচল ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, মহামারিকালে ২০২১ সালে সারা দেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, যার সংখ্যা ৯। এ ছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সংখ্যাটি ৬, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছে ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থীরা, যাদের সংখ্যা ৩ জন।
‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২০’ জরিপে মানুষের মৃত্যুর কারণগুলো খুঁজে বের করেছে বিবিএস।
বয়স্ক মানুষ হার্ট অ্যাটাকে বেশি মারা যাচ্ছে, বাড়ছে আত্মহত্যাও: ৬০ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুহার হিসাব করলে হার্ট অ্যাটাক প্রথমে। মোট মৃত্যুর ২৩ দশমিক ৮ শতাংশই হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। এর পরে রয়েছে ব্রেন স্ট্রোক ১১ দশমিক ৫, শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ১১, হার্ট ডিজিস ৬, অ্যাজমা ৫ দশমিক ২, হাই ব্লাড প্রেশার ৩ দশমিক ৭, ডায়াবেটিস ৩ দশমিক ৩, কিডনি রোগে ২ দশমিক ৯, লিভার ক্যানসার ২ দশমিক ৮, প্যারালাইসিসে ২ দশমিক ২, ব্লাড ক্যান্সারে ১ দশমিক ৯, নিউমোনিয়া ১ দশমিক ৫ ও স্টমাক ক্যান্সারে ১ শতাংশ মানুষ মারা যান। এসব রোগের বাইরে অন্য কারণে দেশের দশমিক ২ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয়।
অপরাপর কারণের মধ্যে আত্মহত্যা, খুন, সাপের কামড়, সড়ক দুর্ঘটনা ও অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যু অন্যতম। বিবিএস মানুষের মৃত্যুর ১০০টি কারণ উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম আত্মহত্যা। সামনে বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস জরিপের মাধ্যমে পৃথকভাবে আত্মহত্যা নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করবে সংস্থাটি। এখন পুলিশের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বিবিএস এসডিজি ট্র্যাকারে আত্মহত্যার রিপোর্ট ইনপুট দিয়ে থাকে। সামনে এ নিয়ে পৃথকভাবে কাজ করার পরিকল্পনা সংস্থাটির।
এ বিষয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের চাইল্ড অ্যাডোলোসেন্ট ও ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, আত্মহত্যা প্রবণতার বড় কারণ বিষণ্নতা। সেটা প্রেমে ব্যর্থ হয়ে হোক কিংবা পরীক্ষায় ফেল করে হোক। আত্মহত্যাকে আমরা এখনও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখি। এটাকে ডিক্রিমিনালাইজ করতে হবে। আত্মহত্যার প্রবণতাকে অপরাধ হিসেবে দেখা অত্যন্ত অমানবিক। ক্রিমিনাল অ্যাক্ট সংশোধন করতে হবে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে মনের যত্ন নিতে হবে।
আত্মহত্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে জাতীয় মানষিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ডা. নাঈম আকতার আব্বাসী বলেন, আত্মহত্যা আসলে অনেক ধরনের মানষিক ও সামাজিক বিভিন্ন পরিপেক্ষিতে হয়। একটা মানুষ যখন আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয় তার পেছনে ব্যাকগ্রাউন্ড ও নানা হিস্টরী থাকে। তারা দেখা যাচ্ছে সমাজে নানা ধরনের হতাশা ও বিষন্নতায় ভুগতে থাকে। যখন কোন মারাত্বক ডিপ্রেশনে চলে যায়, দুনিয়ার বেঁচে থাকার যখন আর কোন আশার আলো পায় না তখনই দেখা যাচ্ছে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। যারা আত্মহত্যা করতে চায় তাদের আশেপাশের পরিবেশটা যদি আমরা পরিবর্তন করতে পারি, তারা যদি সচেতন হয়
তিনি বলেন, আত্মহত্যা কমাতে আমাদের সবারই অনেক কিছু করার আছে। যিনি আত্মহত্যা করতে চান তার আগে থেকেই কিছু লক্ষণ দেখা যায়। সে লক্ষণগুলো যদি আমরা ধরতে পারি। তার কোন ধরনের মানষিক হতাশা, মানষিক চাপ আছে কিনা,সামাজিক কোন চাপ আছে কি না। সেটা যদি আমরা আগে থেকেই নির্ণয় করতে পারি। তাহলে আমরা আত্মহত্যা কমাতে পারবো। সেক্ষেত্রে অবশ্যই তার পরিবার এবং সমাজের বড় ধরনের একটা সহযোগিতা প্রয়োজন। তবে অনেকেই ভালো সাহচার্য পেয়ে আত্মহত্যার পথ থেকে ফিরে আসছে। এরকম শত শত উদাহরণ আছে যারা আত্মহত্যার পথ ছেড়ে আবার সমাজের মূল স্রোতে ফিরে এসেছে।
উল্লেখ্য, গত বুধবার চিত্রনায়ক রিয়াজের শশুর ব্যবসায়ী আবু মহসিন নিজ ফ্ল্যাটে ফেসবুক লাইভে এসে কিছু সময় কথা বলার পর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করেন মহসিন। মাথায় গুলি করার আগে ফেসবুক লাইভে মহসিন বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা, পরিবার নিয়ে হতাশার কথা বলেন। এক নিকটাত্মীয়ের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করে দুঃখও প্রকাশ করেন তিনি।