August 23, 2026, 1:53 am

নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে, নাভিশ্বাস ভোক্তাসাধারণের

নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে, নাভিশ্বাস ভোক্তাসাধারণের

করোনার মধ্যে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যখন কমেছে, সেই সময় হঠাৎ লাগামহীন হয়ে উঠেছে নিত্যপণ্যের দাম। এ যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। রীতিমতো নাভিশ্বাস উঠেছে ভোক্তাসাধারণের।

কারণ, এ মুহূর্তে অসহনীয় উত্তাপ বইছে চাল, ডাল, আটা, মাংস, শাকসবজি, তেল, পেঁয়াজ, মসলাসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে। এক মাসের ব্যবধানে সৃষ্টি হয়েছে এমন পরিস্থিতির। এর মধ্যে পেঁয়াজসহ কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় শতভাগ। আর ৫০ টাকার (প্রতি কেজি) নিচে তো পাওয়াই যায় না কোনো শাকসবজি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ।

অস্বাভাবিক এই দাম বৃদ্ধির পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বারবার সেই পুরনো সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণেই মূলত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে ওই সিন্ডিকেট সদস্যদের চিহ্নিত করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

ফলে নানা ইস্যুতে বছরে কয়েকবার নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজার অস্থিতিশীল করে তোলে তারা। আর সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অল্প সময়ে হাতিয়ে নেয় কয়েক হাজার কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পেঁয়াজের মূল্যে কারসাজির কারণে গত বছর অন্তত ১৫টি সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করেছিল সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। এর মধ্যে এমন তথ্যও পাওয়া গিয়েছিল, একটি পক্ষ বেশি দামে বাংলাদেশে বসে পণ্য আমদানি করছে। আর যেসব দেশ থেকে আমদানি হচ্ছে, ওই সিন্ডিকেটই ওই দেশে বসে পণ্য রফতানি করছে বাংলাদেশে। অর্থাৎ যিনি আমদানিকারক, তিনিই রফতানিকারক। তবে এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ফলে এবারও তারা দাম বাড়িয়ে অস্বাভাবিক মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে।

তবে এই দাম বাড়ানোর পেছনে সেই আগের অজুহাত দেখাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, তিন কারণে পণ্যের দাম বাড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে- ভারতসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যার কারণে পণ্যের উৎপাদন কমেছে। ইন্দো প্রদেশে পেঁয়াজের মোকামে শ্রমিকদের ধর্মঘট এবং মাওয়া ঘাটে ফেরি পারাপার বন্ধের কারণে পণ্য ঢাকায় আসতে পারছে না। ফলে বাজারে সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, কিছু কিছু পণ্যের দাম বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব। তিনি বলেন, বন্যায় অনেক জায়গার শাকসবজি নষ্ট হয়েছে। কোথাও কোথাও ধানও নষ্ট হয়েছে। এ কারণে পণ্যের সরবরাহ কিছুটা কম। বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর আমাদের কারও হাত নেই। তবে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আমরা চেষ্টা করছি।

টিসিবিসহ সরকারি সংস্থাগুলো কাজ করছে। এ ছাড়াও শীত মৌসুম আসছে। এ সময়ে নতুন ফসল ও সবজি আসবে। এতে দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে। পেঁয়াজের দামের ব্যাপারে তিনি বলেন, প্রতিবছর অক্টোবরের পর থেকে আমাদের উৎপাদিত পেঁয়াজ শেষ হওয়া শুরু করে। এরপর আমরা আমদানি করি। তবে গত বছর ভারত রফতানি বন্ধ করে দেয়ার পর আমরা তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করেছি। এতে দাম আর ওইভাবে বাড়বে না।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও এবং বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্যানুসারে করোনার কারণে নতুন করে বাংলাদেশে এক কোটি লোক দরিদ্র হয়েছে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতার কারণে অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। আর এসব সংস্থা যখন এ ধরনের দুরবস্থার সংবাদ দিচ্ছে, সেই সংকটের মধ্যেই নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক দামের কারণে মানুষ অসহায় হয়ে পড়ছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নয়াবাজার ও মালিবাগ কাঁচাবাজার ঘুরে ও খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এদিন প্রতি কেজি মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা জাতের চাল বিক্রি হয়েছে ৪৮-৫০ টাকা। যা এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৪২-৪৪ টাকা। প্রতি কেজি মসুর ডাল (বড়দানা) বিক্রি হচ্ছে ৭৫-৭৮ টাকা, যা এক মাস আগে ছিল ৬৮-৭০ টাকা। খোলা আটা প্রতি কেজি ৩০-৩২ টাকা, এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ২৫-২৬ টাকা।

ভোজ্য তেলের মধ্যে খোলা সয়াবিন প্রতি লিটার বিক্রি হয়েছে ৮৬-৮৭ টাকা, এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৭৯-৮২ টাকা। পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি হয়েছে ৫১০ টাকা, এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৫০০ টাকা।

নয়াবাজারের মুদি বিক্রেতা মো. তুহিন বলেন, মিলারদের কারসাজিতে এখন পর্যন্ত চালের দর বাড়তি। তারা সিন্ডিকেট করে মিল পর্যায় থেকে সব ধরনের চালের দর বাড়িয়ে দিয়েছে। যে কারণে পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে চালের দর বাড়তি। তিনি বলেন, তেল কোম্পানিগুলো নতুন করে রেট দিয়েছে। যে কারণে বেশি দরে এনে বেশি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। কারওয়ান বাজারে কথা হয় বেসরকারি বীমা কোম্পানির কর্মকর্তা আশিকুর রহমানের সঙ্গে।

তিনি বলেন, করোনার কারণে পুষ্টিকর খাবার খেয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সরকারিভাবে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কিন্তু বাজারের যে অবস্থা, তাতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো তো দূরের কথা, খেয়ে বেঁচে থাকা কঠিন। জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। এটি স্বাভাবিক নয়। তার মতে, জিনিসপত্রের দাম বাড়লে একজন আরেকজনের দোষ দেয়। তবে বিষয়টি নজরদারির দায়িত্ব সরকারের। তিনি আরও বলেন, কোনো রকম কারসাজি হলে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

মঙ্গলবার বিভিন্ন খুচরা বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৭০-৭৫ টাকা, এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৩৫-৪০ টাকা। এ হিসাবে প্রায় শতভাগ বেড়েছে পণ্যটির দাম। আর আমদানি করা প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৫৫-৬০ টাকা, এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৩০ টাকা।

দেশি রসুন বিক্রি হয়েছে ১২০ টাকা কেজি, এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৯০-৯৫ টাকা। প্রতি কেজি আদা বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ২৪০ টাকা, এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ১৮০ টাকা। প্রতি কেজি দারুচিনি মাসের ব্যবধানে ৫০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকা।

শ্যামবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী ও আমদানিকারক শঙ্কর চন্দ্র ঘোষ বলেন, ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে পেঁয়াজের মোকামে শ্রমিকরা তিন দিন ধর্মঘট করছিল, সে কারণে দেশের বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ কমেছে। এ ছাড়া মাওয়া ঘাটে ফেরি পারাপার বন্ধ থাকায় পণ্য পরিবহনে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল।

যে কারণে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ কম হওয়া ও মাসের শুরুতে অনেকেই বেতন পেয়ে একবারে বেশি করে পণ্য কিনতে বাজারে আসায় চাহিদা বৃদ্ধি ও পেঁয়াজের সরবরাহ কম থাকায় পণ্যটির দাম বেড়েছিল। তবে গত রোববার ভারত থেকে ৩ হাজার টন পেঁয়াজ এসেছে। ফলে আস্তে আস্তে বাজার স্বাভাবিক হবে বলে জানান তিনি। তার মতে, বেশি কারসাজি করছে খুচরা বিক্রেতারা। তারা সুযোগ বুঝে বাড়তি দরে বিক্রি করছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক বাবলু কুমার সাহা বলেন, ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণে সারা দেশে নিত্যপণ্যের পাইকারি ও খুচরা বাজারে অধিদফতরের তদারকি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশে চাল, আলু, পেঁয়াজসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ ও সরবরাহ রয়েছে। তাই নিত্যপণ্য নিয়ে কারসাজি করলে অধিদফতর জিরো টলারেন্স (শূন্যসহিষ্ণুতা) দেখাবে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, এদিন প্রতি ডজন ডিমে ১০-১৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হয়েছে ১১৫ টাকা। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ১২৫-১৩০ টাকা, এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ১২০ টাকা। সবজির মধ্যে মঙ্গলবার প্রতি কেজি পেঁপে বিক্রি হয়েছে ৪৫-৫০ টাকা, এক মাস আগে ২৫-৩০ টাকা বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি হয়েছে ১২০-১২৫ টাকা, এক মাস আগে ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

পাকা টমেটো প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ১৩০ টাকা, এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকা। প্রতি কেজি গাজর বিক্রি হয়েছে ১১০-১২০ টাকা, এক মাস আগে ৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এদিন প্রতি কেজি বরবটি বিক্রি হয়েছে ৭০-৮০ টাকা, এক মাস আগে ৪৫-৫০ টাকা বিক্রি হয়েছে। প্রতি পিস মাঝারি আকারের লাউ বিক্রি হয়েছে ৭০-৮০ টাকা, এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৫০-৬০ টাকা।

প্রতি কেজি করোলা বিক্রি হয়েছে ৮০-৯০ টাকা, এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৫০-৫৫ টাকা। এ ছাড়া প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয়েছে ৪০ টাকা, এক মাস আগে ২৫-৩০ টাকা বিক্রি হয়েছে। অস্বাভাবিক দাম কাঁচা মরিচে। এপ্রিল মাসে সাধারণ ছুটির শুরুতে কাঁচা মরিচের কেজি ছিল ২০ টাকা। জুন পর্যন্ত মোটামুটি ৫০ টাকার মধ্যে ছিল দাম। বর্তমানে তা ২৪০-২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. লিয়াকদ বলেন, দেশে বন্যার কারণে সরবরাহ কমেছে। ফলে এখন সব ধরনের সবজির দাম বাড়তি। বন্যার কারণে ভারত থেকেও পণ্য কম আসছে। ফলে দেশের বাজারে সবজির দাম বেড়েছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. এম কে মুজেরি বলেন, যে কোনো ব্যক্তিগোষ্ঠীর হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা চলে গেলে ভোক্তার স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়। তাই ভোক্তার সুরক্ষা দিতে হলে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের দরকার প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করে দেয়া। কিন্তু দেশে সেটি হচ্ছে না। কিছু ব্যক্তি-গোষ্ঠীর হাতেই নিত্যপণ্য নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে। এরা কারসাজি করলে তখন সরকারের আর করার কিছু থাকে না।

তিনি মনে করেন, মুক্তবাজার অর্থনীতি থাকবে; কিন্তু তার মানে এই নয়, এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা যা খুশি তাই করার সুযোগ পাবেন। বিশ্বের অনেক দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি থাকলেও সরকারের হাতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশেও এ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রাখতে হবে। এর জন্য দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর মনিটরিং সক্ষমতা মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সুফল দেয়, তার জন্য টিসিবির সক্ষমতাও বাড়ানো জরুরি। নতুবা দেশের প্রেক্ষাপটে ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা দুরূহ বলেই মনে হচ্ছে।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com