February 23, 2026, 12:05 am
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয়ের মাধ্যমে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে ক্ষমতায় এসেই নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থবির অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বাড়তে থাকা বেকারত্ব। বিশ্লেষকদের মতে, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ইতিবাচক বার্তা দিলেও নতুন সরকারকে খুব দ্রুত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থানে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাজনৈতিক পালাবদলের পর দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর বরাতে ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জুনে সমাপ্ত অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩.৭ শতাংশে—যা আগের বছরের ৪.২ শতাংশ ও ২০২৩ অর্থবছরের ৫.৮ শতাংশের তুলনায় কম। তবে চলতি ও আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪.৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ।
কাউন্টারপয়েন্টের সম্পাদক জাফর সোবহান বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পেছনে অর্থনৈতিক অসন্তোষ বড় ভূমিকা রেখেছিল। তাই নতুন সরকারের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি মনে করেন, সরকারের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ দীর্ঘস্থায়ী হবে না; দ্রুত আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
সোসাইটি পলিসি ইনস্টিউট আয়োজিত ‘বাংলাদেশ আফটার দ্য ভোট: ডেমোক্রেসি, রিফর্ম ও ফরেইন পলিসি আউটলুক’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি মুদ্রার স্থিতিশীলতা রক্ষা ও খেলাপি ঋণ কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, গত কয়েক দশকে ৬-৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় থাকলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি কমেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নবনিযুক্ত অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিলুর রহমানের অভিজ্ঞতা সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। সাবেক রাষ্ট্রদূত শহীদ আখতার বলেন, নতুন মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ ও তরুণ প্রজন্মের সমন্বয় দেখা গেছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা পুরোপুরি কাটেনি বলেও মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বড় ধরনের সহিংসতা কমলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও তৈরি পোশাক খাতের বিক্ষোভ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগও এখনও মন্থর।
তবে মুডিস ইতিবাচক দিক হিসেবে ব্যাংকিং ও সংসদীয় সুশাসন জোরদার এবং বিনিময় হার আরও নমনীয় করার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে অক্সফোর্ড ইকোনোমিকস এক প্রতিবেদনে বলেছে, বিএনপি বাজারমুখী নীতি বজায় রাখবে, যদিও বাস্তবায়নে ঝুঁকি রয়েছে।
আরও বড় চ্যালেঞ্জ সামনে আসছে নভেম্বরে, যখন বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উত্তরণ করবে। এতে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা প্রত্যাহার হলে রপ্তানি আয় ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতকে তখন ভিয়েতনাম ও ভারতের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে উদ্যোগ নিতে পারেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর তিনি ভারতে আশ্রয় নেন, যা দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করে। পরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, সাম্প্রতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রকাশ্য বৈরিতার লক্ষণ নেই। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত রাখা জরুরি।
সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন সরকারকে অর্থনৈতিক সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি—সবক্ষেত্রেই দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা এখন বাস্তব ফলাফলের দিকে। সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
ইএটি
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.