February 20, 2026, 10:15 pm
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিটি ব্যাংক পিএলসি-তে সুশাসন, নৈতিকতা ও জবাবদিহি আজ কেবল কাগুজে স্লোগানে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকের নিজস্ব বিনিয়োগ নীতিমালার ফাঁকফোকরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আমানতকারীদের তহবিল থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর তদন্ত প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের তিনজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা ব্যাংকের পুঁজিবাজার তহবিলকে কার্যত ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত করেছেন—যেখানে ঝুঁকি বহন করেছে ব্যাংক, আর লাভ জমেছে কর্মকর্তাদের পকেটে।
যে ব্যাংকের মালিকানায় রয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি)-এর মতো বিনিয়োগকারী, যে ব্যাংক হংকংভিত্তিক সাময়িকী ফাইন্যান্স এশিয়া-এর বিবেচনায় ২০২৫ সালে সেরা ব্যাংকের স্বীকৃতি পেয়েছে এবং যার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন ‘সিইও অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারে ভূষিত—সেই ব্যাংকের অন্দরমহলেই শীর্ষ কর্মকর্তারা সিন্ডিকেট করে আমানতকারীদের টাকা লুট করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বাহ্যিক ব্র্যান্ড ইমেজ ও পুরস্কারের ঝলকানির আড়ালে ভয়ংকর এক অন্ধকার বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিএসইসির তদন্তের সূত্রপাত হয় সিটি ব্যাংকের সাবেক ক্যাপিটাল মার্কেট পোর্টফোলিও ম্যানেজার মো. সানোয়ার খানকে ঘিরে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তিনি নিজের ও তাঁর স্ত্রীর বিও অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ব্যাংকের তহবিলের সঙ্গে সরাসরি ‘কাউন্টারপার্টি ট্রেডিং’-এ জড়িত ছিলেন। অর্থাৎ, একদিকে তিনি ব্যাংকের পক্ষে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, অন্যদিকে একই লেনদেনে ব্যক্তিগত ক্রেতা হিসেবেও হাজির হচ্ছেন তিনি নিজেই। এটি সুস্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত এবং নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন।
বিএসইসির প্রতিবেদনে অগ্নি সিস্টেমস, ক্যাপিটেক জিবিএফ ইউনিট ও বিডি পেইন্টসের শেয়ারে সংঘটিত লেনদেনগুলোকে ‘নজিরবিহীন’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, ব্যাংকের তহবিল ব্যবহার করে ৩০ টাকায় শেয়ার কেনার পর একই শেয়ার আবার ৪১.২০ টাকায় ব্যাংকের কাছেই বিক্রি করে কোটি টাকার অবৈধ মুনাফা করেছেন সানোয়ার খান ও তাঁর স্ত্রী। সবচেয়ে বেশি মুনাফা এসেছে ক্যাপিটেক জিবিএফ ইউনিটের লেনদেন থেকে। ব্যাংক যেখানে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে লোকসান গুনছে, সেখানে আমানতকারীদের অর্থেই কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ ফুলে-ফেঁপে উঠেছে।
এই কেলেঙ্কারি কেবল সানোয়ার খানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিএসইসির তদন্তে একই ধরনের অবৈধ সুবিধা গ্রহণের প্রমাণ মিলেছে সিটি ব্যাংকের আরও তিন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক—এ কে এম সাইফ উল্লাহ কাওছার, মোহাম্মদ মাহমুদ গনি ও মো. আশানুর রহমানের বিরুদ্ধে। তদন্তে দেখা যায়, তাঁরা ব্লক মার্কেটে সিটি ব্যাংকের তহবিল থেকে কম দামে শেয়ার কিনে আবার সেই তহবিলের কাছেই বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করে অন্যায্য মুনাফা করেছেন। মিডল্যান্ড, ফাইন ফুডস, ওরিয়ন ইনফিউশনস ও সানলাইফসহ বিভিন্ন শেয়ারে তাঁদের লেনদেনের মাধ্যমে ব্যাংকের কোষাগার থেকে ব্যক্তিগত পকেটে টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, এ কে এম সাইফ উল্লাহ কাওছার ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ১১টি লেনদেনে প্রায় ২২ লাখ ৮৫ হাজার টাকার বেআইনি মুনাফা করেন। মোহাম্মদ মাহমুদ গনি একই কৌশলে প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার টাকা এবং মো. আশানুর রহমান প্রায় ৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা অন্যায্য লাভ করেন। এসব লেনদেন সরাসরি ব্যাংক তহবিলের নৈতিক ব্যবহার এবং কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতার প্রশ্নে গুরুতর আঘাত হেনেছে।
বিএসইসি গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে জানতে চায়, তহবিল অপব্যবহারের দায়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর কয়েক দিনের মধ্যেই সানোয়ার খানকে চাকরিচ্যুত করা হয়। কিন্তু অন্য তিন উপব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে প্রশ্ন উঠেছে—একজনকে বলির পাঁঠা বানিয়ে কি প্রভাবশালীদের আড়াল করা হয়েছে?
এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র জানিয়েছেন, ব্যাংকের জবাব পাওয়ার পর বিষয়টি এনফোর্সমেন্ট বিভাগে পাঠানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রও স্পষ্ট করে বলেছেন, পদভেদে শাস্তির ভিন্নতা হওয়ার সুযোগ নেই এবং আইন ভঙ্গকারী প্রত্যেককেই শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
এসআর
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.