February 20, 2026, 10:14 pm
অবকাঠামো উন্নয়নের নামে নেওয়া বড় বড় প্রকল্পে অতিমূল্যায়ন, দুর্নীতি ও দুর্বল সুশাসনের কারণে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ঋণঝুঁকির ফাঁদের দিকে এগোচ্ছে-এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন গবেষকরা। তাঁদের মতে, ঋণ নিলে সমস্যা নয়; সমস্যা হচ্ছে ব্যয় নিয়ন্ত্রণহীনতা, অস্বচ্ছ চুক্তি এবং জবাবদিহিতার অভাব। যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে।
গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘সরকারি ঋণ ও সুশাসন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ গবেষণা উপস্থাপন করা হয়। গবেষণাটি পরিচালনা করেছে যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ একটি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সহযোগিতায় একটি আন্ত্মর্জাতিক দাতব্য সংস্থা এবং দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ।
ঋণের উল্লম্ফন
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১২ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাত্ ১৬ বছরে বৃদ্ধি প্রায় ৩৭৭ শতাংশ। একই সময়ে সুদ পরিশোধের চাপ দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে সরকারি আয়ের প্রতি ৫ টাকার মধ্যে ১ টাকা শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে কম অর্থ থাকছে।
২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পরিবহন, বিদ্যুত্, বন্দর, বিমান চলাচল ও শিল্পাঞ্চলসহ ৪২টি বড় প্রকল্প বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর মধ্যে ২৯টি প্রকল্পে গড়ে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দুর্নীতি, অদক্ষতা ও যোগসাজশের মাধ্যমে হারিয়ে গেছে।
আলোচনায় অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুশতাক এইচ খান বলেন, চুক্তির দামে সামান্য বাড়তি নির্ধারণও দীর্ঘমেয়াদে বিশাল আর্থিক বোঝা তৈরি করে। কয়েক সেন্ট বেশি দামে বিদ্যুত্ কিনলেও ২০ থেকে ২৫ বছরে তা বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত দায়ে রূপ নেয়। তাঁর মতে, সমস্যা শুধু ঋণের পরিমাণ নয়; বরং প্রতিযোগিতাহীন চুক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল জবাবদিহিতাই বড় ঝুঁকি।
গবেষণায় অবকাঠামো প্রকল্পে দুই ধরনের ব্যর্থতার কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, প্রকল্প সঠিকভাবে নির্মিত হলেও দাম অতিরিক্ত বেশি ধরা হয়। এতে আয় দিয়ে ব্যয় ওঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, দুর্বল পরিকল্পনা ও ত্রম্নটিপূর্ণ নকশার কারণে অনেক প্রকল্প প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারে না। ফলে আয় কম হয়, কিন্তু ঋণের কিস্তি নিয়মিত দিতে হয়।
বিদ্যুত্ খাতে চাপ
গবেষণার তথ্যে বিদ্যুত্ খাতকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে। ২০২৫ সালে স্থির সক্ষমতা চার্জ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। অর্থাত্ বিদ্যুত্ ব্যবহার হোক বা না হোক, সরকারকে নির্দিষ্ট অঙ্ক পরিশোধ করতে হচ্ছে। উচ্চমূল্যের চুক্তির কারণে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যাতে খুচরা বিদ্যুতের দাম সহনীয় রাখা যায়। ভর্তুকি বন্ধ হলে বিদ্যুতের দাম ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত্ম বাড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে।
২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিদ্যুত্ উত্পাদকদের পরিশোধ ১১ গুণ এবং সক্ষমতা চার্জ ২০ গুণ বেড়েছে, অথচ উত্পাদন বেড়েছে মাত্র চার গুণ। অনেক কেন্দ্র জ্বালানি সংকটে অলস থাকলেও চুক্তির কারণে অর্থ পরিশোধ অব্যাহত রয়েছে।
শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা
গবেষণায় ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার আর্থিক সংকটের উদাহরণ তুলে ধরা হয়। দেশটির প্রায় ৬৫ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয়েছিল। কিন্তু অনেক প্রকল্প প্রত্যাশিত আয় দিতে পারেনি। সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ্রা রাজাপাকশে’র সময় নেওয়া একাধিক প্রকল্প পরে অকার্যকর হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত আয় না থাকায় ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত দেশটি গভীর সংকটে পড়ে।
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। প্রকৃত ঋণ-জিডিপি অনুপাত সংশোধিত হিসাবে ৪২ শতাংশ, যেখানে আগে ৩৩ শতাংশকে নিরাপদ বলা হতো। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই অনুপাত ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেন, কেবল স্বচ্ছতা নয়, কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দরপত্র প্রক্রিয়ায় উন্মুক্ত তথ্য প্রকাশ, প্রকল্প শুরম্নর আগে জমি ও নকশা প্রস্তুতি যাচাই, কর্মসম্পাদনের সঙ্গে অর্থ পরিশোধ যুক্ত করা এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নাম প্রকাশ-এসব ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
আলোচনায় চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের জাকির হোসেন খান বলেন, জ্বালানি হলো অর্থনীতির প্রাণশক্তি। কিন্তু আমাদের বৈদেশিক ঋণ ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করার পরেও যদি দুর্নীতিতে নিমিজ্জিত বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতে বার্ষিক ৫ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হয়, তবে বাংলাদেশ দ্রুতই আর্থিক দেউলিয়াত্বের দিকে এগিয়ে যাবে। বিদ্যুত ও জ্বালানি মহাপরিকল্পনা দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ডদের দ্বারা হাইজ্যাক হয়েছে।
ইউএনডিপির কান্ট্রি ইকোনমিক অ্যাডভাইজার ওয়াইস পারে বলেন, ক্রমবর্ধমান ঋণ অবকাঠামো এবং সামাজিক সুরক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে প্রতিফলিত করে। ঝুঁকি হলো অর্থায়ন থেকে নীতিকে বিচ্ছিন্ন করা; ঋণ গ্রহণ যেন প্রকৃত, টেকসই উন্নয়নে রূপান্তরিত হয় তা নিশ্চিত করতে আমাদের অবশ্যই সমন্বিত পরিকল্পনা এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার মাধ্যমে এই ব্যবধান ঘুচিয়ে দিতে হবে।
এফসিডিও’র গভর্নেন্স অ্যাডভাইজার এমা উইন্ড বলেন, বাংলাদেশ যেহেতু এলডিসি উত্তরণের কাছাকাছি পৌঁছেছে, বিদ্যুত্ খাতের সংস্কার একটি আর্থিক আবশ্যকতা। প্রকিউরমেন্ট (সংগ্রহ) প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে আইএমএফ সুশাসন ডায়াগনস্টিকস এবং দাতাদের দক্ষতা ব্যবহার করে আমরা একটি আর্থিকভাবে স্থিতিশীল, জ্বালানি-সুরক্ষিত ভবিষ্যত্ নিশ্চিত করতে পারি যা জাতি এবং এর বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন অংশীদার উভয়কেই উপকৃত করবে।
বিপিডিবি’র পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা বলেন, বিশেষ আইন বাতিল করা এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রবর্তন করার ফলে সৌরবিদ্যুতের শুল্ক ১০ সেন্ট থেকে কমিয়ে ৫-৮ সেন্টে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। জমির লভ্যতা এবং জ্বালানি বহুমুখীকরণকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমরা কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলোকে একটি টেকসই, সাশ্রয়ী জ্বালানি ভবিষ্যতে রূপান্তর করছি।”
নবায়নযোগ্য জালানি সংগঠন বিএসআরইএ প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আল মাহমুদবলেন, যেখানে সৌরবিদ্যুতের দাম ৫ সেন্টের নিচে, সেখানে আমাদের আমদানির পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার নষ্ট করা বন্ধ করতে হবে। গ্রিড-সংলগ্ন জমির মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমপ্রসারণ করা এখন আর কোনো বিকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের বেঁচে থাকার জন্য একটি অপরিহার্য কৌশল।
বাংলাদেশ আমেরিকা অ্যালায়েন্সের কো-চেয়ার কাওসার চৌধুরী, ৫ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি এবং ৯,৫০০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত সক্ষমতা নিয়ে আমরা এক অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। খরচ এবং দুর্নীতি কমাতে সরকারি জমিতে, যেমন খালের ওপর, প্রতিযোগিতামূলক সৌরবিদ্যুত্ প্রকল্প অপরিহার্য।
এসআর
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.