July 22, 2026, 1:02 am
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বেসরকারি সাউথইস্ট ব্যাংক লি. এর চেয়ারম্যানের সাথে পরিচালনা পর্ষদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরমে পৌছেছে। যাকে তাকে ঋণ প্রদান, মেশিন কেনায় নয়-ছয়, টাকা পাচার, ঋণ মওকুফ করেও পারসেন্টেজ নিয়েছেন চেয়ারম্যান আলমগীর কবির। শুধু তাই নয়, নিয়ম-বহির্ভূত নিজের ছেলেকে পর্ষদের পরিচালক নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। গত ৩০ জুন প্রতিবাদ স্বরুপ ব্যাংকটির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) বয়কট করেন পাঁচ শেয়ারহোল্ডার ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এমএ কাশেম, আজিম উদ্দিন আহমেদ, জুসনা আরা কাশেম, দুলুমা আহমেদ ও রেহানা রহমান।
ক্ষুব্ধ পরিচালনা পর্ষদ সদস্যরা বলছেন, ব্যক্তিস্বার্থে ব্যাংকটিকে চেয়ারম্যান ঝুকিঁর দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ ঋণ প্রদান ও বিশেষভাবে ঋণের সুদ মওকুফের মাধ্যমে তিনি নিজে লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ব্যাংক, এর শেয়ারহোল্ডার ও এর গ্রাহকরা। এমতাবস্থা চলতে থাকলে ব্যাংক ধ্বংস হয়ে যাবে। ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে গত ২৬ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর নানা অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন ওই পাঁচ প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। লিখিত অভিযোগের পর ইতোমধ্যে তদন্তও শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সাউথইস্ট ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে সাউথইস্ট ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়। কোনো উদ্যোক্তা না হয়েও ২০০২ সালে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হন পেশাদার হিসাববিদ আলমগীর কবির। ২০০৪ সালে তিনি চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব নিয়ে ১৭ বছর ধরে বিরতিহীন পদে আসীন তিনি।ছেলে রাইয়ান কবির ২০০৩ সালে সাউথইস্ট ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগে চাকরিতে নিযুক্ত হন। সেই ছেলেকেও বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে পরিচালক বানিয়েছেন আলমগীর কবির। অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে ব্যাংকটি চললেও সাম্প্রতিক বছরে নানা অনিয়মে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে ব্যাংকটি। স্বেচ্ছাচারিতা, হরিলুট, জালিয়াতি, দুর্নীতি এবং অর্থপাচারের মতো অভিযোগ চরম শঙ্কায় ফেলেছে হাজার হাজার গ্রাহকের আমানতকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকে করা পরিচালনা পর্ষদের লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি পরিচালনা পর্ষদে নতুন পরিচালক হিসেবে যোগ দিয়েছেন চেয়ারম্যান আলমগীর কবিরের পুত্র রাইয়ান কবির। শেয়ার কিনেছে বে লিজিং ও ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সাউথইস্ট ব্যাংকের ১১৮ কোটি ৮৯ লাখ ৪০ হাজার ৫২২ শেয়ারের ২ শতাংশ অর্থাৎ ২ কোটি ৩৭ লাখ ৭৮ হাজার ৮১০টি শেয়ার কিনতে প্রতিটি গড়ে প্রায় ১৩ টাকা হিসেবে প্রায় ৩০ কোটি টাকার প্রয়োজন। আলমগীর কবির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অনৈতিকভাবে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে এই বিপুল অর্থের যোগান দিয়েছেন। এ বে-আইনী কর্মকান্ড সাউথইস্ট ব্যাংকের বোর্ড সভায় পাস করিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে সভায় কম সংখ্যক এজেন্ডা আলোচনা করা হলেও, ডাইরেক্টরদের উপস্থিত দেখিয়ে সবগুলো এজেন্ডা পাস দেখানো হয়। আবার এজেন্ডার শেষ দিকে Miscellaneous নামে একটা এজেন্ডা থাকে, যেখানে নিজের ইচ্ছামত সব এজেন্ডা ঢুকিয়ে বোর্ড মিটিং এ পাস হওয়া মেমোতে নিজের পছন্দমত পাতা পরিবর্তন করে দেন। তাতে মেমোর শর্ত, ঋণের পরিমান ও মেয়াদ পরিবর্তন করে দেন। এসবই চলছে আলমগীর করিব ও তার ছেলের প্রত্যক্ষ নির্দেশে।
ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধি, প্লেসমেন্ট ও টার্ম ডিপোজিট নিয়ে নয়-ছয়:
ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আলমগীর কবিরের পরিবার নিয়ন্ত্রিত বে লিজিং এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড (বিএলআই) থেকে ২০২০ সালে ১৫ অক্টোবরে মুনিরুজ্জামান সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিচালক হন। তার আগে সাউথইস্ট ব্যাংক বিএলআই’এর কোন ঋণ ছিল না। ওই বছরের ২৪ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক এনওসি দেয়। কিন্তু সে সময় সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে ২১০ কোটি টাকা ঋণ ছিল বিএলআই ক্যাপিটাল লি. এর, যা গুরুতর অপরাধ।
বর্তমানে বিএলআই এর ঋণ হিসেবে কর্পোরেট শাখায় ওডি হিসেবে ২০০ কোটি টাকা, যা দেড় থেকে পৌনে ২ শতাংশ হারে ৭৫ কোটি টাকা কলমানি হয়। সেখান থেকে প্লেসমেন্ট ও টার্ম ডিপোজিট হিসেবে সাড়ে ৪ শতাংশ হারে ১০০ কোটি টাকা রয়েছে। এই টার্ম ডিপোজিট প্রথমে ১ মাস ছিল, পরে তা ৩ মাস এবং আরও পরে ৬ মাসে রুপান্তর করা হয়। বিএলআই যেহেতু শুধু সুদই শোধ করছে এবং এই কোম্পানি মূল ঋণ (চৎরহপরঢ়ধষ ধসড়ঁহঃ) শোধ করতে পারছে না। কিন্তু বিএলআই প্রতিষ্ঠানটি আলমগীর কবিরের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে থাকায় ব্যাংক বিএলআই এর নিকট থেকে মূল ঋণ ফেরতের আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে বেআইনীভাবে ক্রমাগত ঋনের মেয়াদ বৃদ্ধি করে আসছে।
কল মানি থেকে বিএলআই ঋণের পরিমাণ ব্যালেন্স শিটে কম দেখানোর অভিযোগ:
সাউথইস্ট ব্যাংকের কল মানি’র ১৩০০ কোটি টাকা হতে শুধু বে লিজিং এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড(বিএলআই) ঋণ পায়। অথচ বিএলআই-এর বর্তমানে মোট প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ঋণ সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটে দেখানো হয় না বলেও অভিযোগ পর্ষদের। যা ব্যাংকিং খাতে এটি খুবই গুরুতর অপরাধ।
গত ৮ জুলাই বিএলআই-কে আরও ১২ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ১১৮৮ কোটি টাকা, পরিচালক হিসেবে বিএলআই-এর অংশ ২.৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ২৭ কোটি টাকা। আইন অনুযায়ী পরিচালক বিএলআই শুধুমাত্র ১৩.৫ কোটি টাকা ঋণ পাওয়ার যোগ্য। অথচ বিএলআই প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা ভোগ করেছে।
সুদ দিতে হবে না বলে হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণে কমিশন গ্রহণ:
পাঁচ বছরে ঋণের বিপরীতে সুদ দিতে হবে না গ্রাহককে, এই বলে মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেন সাউথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলমগীর কবির। তারপরও ক্লায়েন্ট এর ঋণ এর “সুদ মুক্ত ব্লকড একাউন্ট” এ দিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে তিনি জাজ ভুঁইয়াকে ৩০০ কোটি টাকা, সুয়াদ গার্মেন্টকে ১৫ কোটি, ফাহমী নিটকে ৩০০ কোটি টাকা, কেয়া গ্রুপকে ৯০০ কোটি টাকা, মাহাবুব স্পিনিং কে ১৫০ কোটি টাকার ঋণ দিয়ে Single Borroer Exposer Limit cross করা হয়েছে। তবে এই কারসাজির মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে তিনি শত কোটি টাকা কমিশন নিয়েছেন বলে দাবি পর্ষদ সদস্যদের।
ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন কেনার নামে অর্থ পাচার:
সাউথইস্ট ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় সাম্প্রতিক সময়ে ১৮৫টি ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম) স্থাপন করা হয়েছে। আরও ৩০০টি মেশিন আমদানির প্রক্রিয়াধীন। তবে এসব মেশিন কেনার নামে প্রকৃত মূল্যের অতিরিক্ত অর্থ ওভার ইনভয়েসিং এর মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়েছে। অর্থ পাচার দুভাবে হয়েছে। ওভার ইনভয়েসিং এর অতিরিক্ত টাকা আর এন্ড এন ট্রেড হোল্ডিং’কে ট্রান্সফার করা হয়েছে এবং তিন কোম্পানির কাছে এলসি করা হয়েছে।
আলমগীর কবিরের পুত্র রাইয়ান কবির সিংগাপুরে আর এন্ড এন ট্রেড হোল্ডিং’কে, ইএক্সচেঞ্জ সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লি. আর এন্ড এন মেরিন এন্ড শিপ ট্রেড প্রাইভেট লি. নামীয় তিনটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে প্রায় ২০ কোটি টাকার অধিক অর্থ শেয়ার মানি ইকুইটি হিসেবে বিনিয়োগ করেছেন এবং প্রতিবছর বিভিন্ন উপায়ে এদেশ থেকে অর্থ পাচার করে কোম্পানিগুলোর নেট ইক্যুইটি বৃদ্ধি করছেন। যা রাইয়ান কবিরের আয় হিসেবে ঘোষনা নেই। বৈধ উৎসবিহীন এত বড় অঙ্কের অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এর অনুমতি ছাড়া অবৈধ পন্থার বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য সাউথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলমগীর কবিরের সাথে একাধিক বার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।